অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে যখন ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন’ গানের সুরের রেশ মাত্র কাটতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই শুরু হলো এক লাল ঝড়ের তান্ডব। ম্যাচের শুরু থেকেই লিভারপুলের আক্রমণভাগের তীব্রতা ছিল দেখার মতো। ফুটবল প্রেমীদের জন্য এটি ছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর রাত, যেখানে একের পর এক আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়েছে ওয়েস্ট হামের রক্ষণভাগ। শেষ পর্যন্ত
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল উঠে আসায় প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট টেবিলের লড়াই এখন আরও জমে উঠেছে। ৫-২ গোলের এই বিশাল জয় কেবল তিনটি পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং সমর্থকদের মনে ইউরোপ সেরার মঞ্চে ফেরার বড় আশাও জাগিয়েছে।
অ্যানফিল্ডের সেই জাদুকরী রাত এবং ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল
ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার পর ঘড়ির কাঁটা তখনো পাঁচ মিনিট ছোঁয়নি। মাঠের চারদিকে যখন সমর্থকদের গগণবিদারী চিৎকার, ঠিক তখনই কর্নার থেকে উড়ে আসা বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে ওয়েস্ট হামের রক্ষণ। সেই সুযোগকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে উগো একিতিকে বল জালে জড়িয়ে দেন। এই গোলের মাধ্যমেই মূলত শুরু হয় লিভারপুলের গোল উৎসব। পুরো নব্বই মিনিট জুড়ে যেন ওয়েস্ট হামের ওপর দিয়ে এক অপ্রতিরোধ্য ঝড় বয়ে গেল। খেলার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রোমাঞ্চে ঠাসা, যা দর্শকদের এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পলক ফেলতে দেয়নি।
এই জয়ের মাধ্যমে লিভারপুল প্রমাণ করেছে কেন তারা ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি। বিশেষ করে তাদের আক্রমণভাগের সমন্বয় এবং সুযোগ সন্ধানী মনোভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। মাঝমাঠ থেকে রক্ষণভাগ, প্রতিটি বিভাগেই ছিল দারুণ ভারসাম্য। লিভারপুলের এই আগ্রাসী ফুটবল কৌশলের সামনে ওয়েস্ট হামের খেলোয়াড়দের বারবার দিশেহারা দেখিয়েছে। ফলশ্রুতিতে,
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল তাদের প্রাপ্য জায়গাটি ছিনিয়ে নিয়েছে। বর্তমান সময়ে দলটির এমন ছন্দবদ্ধ ফুটবল ভক্তদের জন্য পরম আনন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেট-পিসে লিভারপুলের নিখুঁত রণকৌশল
এই ম্যাচে লিভারপুলের জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তাদের নিখুঁত ‘সেট-পিস’। কর্নার থেকে যেভাবে একের পর এক আক্রমণ তৈরি হয়েছে, তাতে ওয়েস্ট হামের রক্ষণভাগের করার কিছুই ছিল না। ২৪ মিনিটে দমিনিক সোবোসলাইয়ের দারুণ এক কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে মাথা ছুঁইয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন দলের অন্যতম ভরসা ভার্জিল ফন ডাইক। তার সেই হেড দেখার পর গ্যালারিতে উল্লাসের বাঁধ ভেঙে যায়। প্রথমার্ধের ৪৩ মিনিটে আসে তৃতীয় গোল, এবার গোলদাতার তালিকায় নাম লেখান আর্জেন্টাইন তারকা আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। টানা দুই ম্যাচে জালের দেখা পাওয়া এই মিডফিল্ডার এখন দলের অন্যতম ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
মজার ব্যাপার হলো, লিভারপুলের প্রথম তিনটি গোলই এসেছে কর্নার থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে। এটি নির্দেশ করে যে কোচ অনুশীলনে সেট-পিস নিয়ে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতিটি আক্রমণে ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা এবং কার্যকর প্রয়োগ। অন্যদিকে ওয়েস্ট হামের ডিফেন্ডাররা বারবার বল বিপদমুক্ত করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলছিলেন। তাদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে নিয়েছে। প্রিমিয়ার লিগের মতো কঠিন প্রতিযোগিতায় এমন দাপুটে পারফরম্যান্স সত্যিই বিরল।
ম্যাচের গোলদাতার তালিকা ও সময়
| খেলোয়াড় |
দল |
সময় (মিনিট) |
| উগো একিতিকে |
লিভারপুল |
৫ মিনিট |
| ভার্জিল ফন ডাইক |
লিভারপুল |
২৪ মিনিট |
| আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার |
লিভারপুল |
৪৩ মিনিট |
| টমাস সুচেক |
ওয়েস্ট হাম |
৫০ মিনিট |
| কোডি গাকপো |
লিভারপুল |
৬৭ মিনিট |
কোডি গাকপোর ভুল থেকে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন
বিরতির পর খেলা শুরু হলে টমাস সুচেক যখন ওয়েস্ট হামের হয়ে একটি গোল শোধ করলেন, তখন অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে কিছুটা নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। সমর্থকদের মনে শঙ্কা জেগেছিল, তবে কি ওয়েস্ট হাম ফিরে আসতে যাচ্ছে? কিন্তু কোডি গাকপো তখন নিজের অন্য এক রূপ প্রমাণের নেশায় বুঁদ ছিলেন। কিছুক্ষণ আগেই অবিশ্বাস্য এক মিস করে তিনি সমর্থকদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছিলেন। তবে সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে তিনি খুব বেশি সময় নেননি। মিনিটখানেক পরেই মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে দারুণ এক দৌড়ে তিনি বল জালে জড়ান। এই গোলের মাধ্যমেই মূলত ওয়েস্ট হামের ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
গাকপোর এই গোলটি ছিল দেখার মতো। একজন দক্ষ স্ট্রাইকারের মতোই তিনি গোলরক্ষককে পরাস্ত করেছেন। তার এই আত্মবিশ্বাস লিভারপুলের বাকি সতীর্থদেরও উজ্জীবিত করেছে। খেলার শেষ দিকে ওয়েস্ট হাম আরও একটি গোল শোধ দিলেও তা ছিল শুধুই সান্ত্বনা। বরং ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আক্সেল দিসাসির আত্মঘাতী গোল ওয়েস্ট হামের পরাজয়ের গ্লানি আরও বাড়িয়ে দেয়। দিনশেষে
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে মাঠ ছেড়েছে। এই জয়টি বিশেষ করে গাকপোর জন্য ছিল এক বিশেষ বার্তা যে তিনি এখনো ফুরিয়ে যাননি।
পয়েন্ট টেবিলের লড়াই এবং ইউরোপ সেরার স্বপ্ন
এই বিশাল জয়ের পর প্রিমিয়ার লিগ টেবিলের সমীকরণ অনেকটাই পাল্টে গেছে। এখন শীর্ষ চারে ওঠার দৌড়ে লিভারপুল অনেক শক্তিশালী অবস্থানে। বর্তমানে
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল উঠে আসার ফলে চ্যাম্পিয়নস লিগের টিকিট এখন তাদের একদম হাতের নাগালে। প্রতিটি ম্যাচ এখন ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ওয়েস্ট হামের রেলিগেশন শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে। ১৮ নম্বর অবস্থানে থাকা দলটির জন্য আগামী দিনগুলো বেশ কঠিন হতে চলেছে। তাদের ২৮ ম্যাচে পয়েন্ট মাত্র ২৫, যা রেলিগেশন অঞ্চল থেকে বাঁচার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।
লিভারপুলের সমর্থকদের জন্য এটি একটি স্বস্তির বিষয় যে তাদের প্রিয় দল সঠিক সময়ে সঠিক ছন্দে ফিরেছে। প্রিমিয়ার লিগের লড়াই সবসময়ই অনিশ্চিত, তবে এই ধরনের বড় জয় দলের মানসিক শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
খেলার জগৎ নিয়ে যারা নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন যে লিভারপুল সবসময়ই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে পছন্দ করে। এবারের প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। নিচের টেবিলে বর্তমান শীর্ষ পাঁচ দলের অবস্থান দেখানো হলো:
| অবস্থান |
দল |
ম্যাচ |
পয়েন্ট |
| ১ |
ম্যানচেস্টার সিটি |
২৮ |
৬৫ |
| ২ |
আর্সেনাল |
২৮ |
৬২ |
| ৩ |
লিভারপুল |
২৮ |
৫৯ |
| ৪ |
অ্যাস্টন ভিলা |
২৮ |
৫৮ |
| ৫ |
লিভারপুল (আপডেট) |
২৮ |
৫৭* |
*উল্লেখ্য: পয়েন্ট টেবিলের অবস্থান প্রতি রাউন্ড শেষে পরিবর্তনশীল।
ওয়েস্ট হামের ব্যর্থতা ও রেলিগেশন ঝুঁকি
ওয়েস্ট হামের জন্য এই ম্যাচটি ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। শুরু থেকেই তারা চাপে ছিল এবং সেই চাপ থেকে বের হতে পারেনি। রক্ষণে সমন্বয়হীনতা এবং গোলরক্ষকের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত তাদের বড় হারের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মূলত মাঝমাঠে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারাই ছিল তাদের প্রধান ব্যর্থতা। লিভারপুলের মিডফিল্ডারদের যেভাবে তারা জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, তা ছিল আত্মঘাতী।
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ওয়েস্ট হামের রক্ষণভাগের উপহার দেওয়া সুযোগগুলোর গুরুত্ব ছিল অনেক।
আগামী ম্যাচগুলোতে ওয়েস্ট হামকে যদি টিকে থাকতে হয়, তবে তাদের খেলার কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। আক্রমণভাগে টমাস সুচেক একা চেষ্টা করলেও বাকিদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন মেলেনি। অন্যদিকে লিভারপুলের রক্ষণভাগে ভার্জিল ফন ডাইকের নেতৃত্ব ছিল দেখার মতো। তিনি কেবল গোলই করেননি, বরং ওয়েস্ট হামের আক্রমণগুলোকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেছেন। ফলে
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল জয়ের আনন্দে মেতে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। অলরেডদের এই আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে যেকোনো বড় দলের রক্ষণভাগ ভেঙে পড়তে বাধ্য।
লিভারপুলের জয়ের মূল কারণসমূহ:
- সেট-পিসে দক্ষতা: প্রথম তিনটি গোলই এসেছে কর্নার থেকে।
- মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ: ম্যাক অ্যালিস্টার এবং সোবোসলাই পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
- আক্রমণভাগের গতি: গাকপো এবং একিতিকের গতি ওয়েস্ট হামের রক্ষণকে তছনছ করে দিয়েছে।
- ঘরের মাঠের সুবিধা: অ্যানফিল্ডের সমর্থকদের সমর্থন লিভারপুলকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
সমর্থকদের প্রত্যাশা ও আগামী দিনের পথচলা
লিভারপুলের সমর্থকরা সবসময়ই চায় তাদের দল ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোর সাথে লড়াই করুক। মাঝখানে কিছু খারাপ সময় গেলেও
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল ফিরে আসাটা একটি ইতিবাচক সংকেত। সামনের ম্যাচগুলোতেও যদি এই জয়ের ধারা বজায় থাকে, তবে চারে ওঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কোচের অধীনে খেলোয়াড়রা যেভাবে নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছেন, তা প্রশংসার দাবিদার। প্রিমিয়ার লিগের প্রতিটি পয়েন্ট এখন সোনার হরিণ, আর লিভারপুল সেই হরিণ শিকারে বেশ পটু বলেই মনে হচ্ছে।
খেলার মাঠে জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু লিভারপুল যেভাবে ৫-২ ব্যবধানে জিতেছে, তা তাদের সামর্থ্যের পরিচয় দেয়। ওয়েস্ট হামের মতো দলের বিপক্ষে এমন ব্যবধান তৈরি করা সহজ কাজ নয়। তবে ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা, এখানে শেষ বাঁশি বাজার আগে কিছুই নিশ্চিত নয়।
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল উঠে আসার পর এখন অলরেড ভক্তদের চোখ থাকবে পরবর্তী বড় ম্যাচের দিকে। তারা আশা করছে, তাদের প্রিয় দল এভাবেই দাপট দেখিয়ে বাকি পথ টুকুও পাড়ি দেবে।
শেষ কথা
লিভারপুলের এই বিশাল জয়টি কেবল প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট টেবিলেই প্রভাব ফেলেনি, বরং এটি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসকেও এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ৫-২ গোলের এই ফলাফল অলরেডদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের জয়গান গায়।
ওয়েস্ট হামকে গোলে ভাসিয়ে পাঁচ নম্বরে লিভারপুল এখন নতুন উদ্দীপনায় সামনের দিকে তাকাচ্ছে। ফুটবল প্রেমীদের জন্য এই ম্যাচটি ছিল নিখাদ বিনোদনের উৎস। প্রতিটি গোল, প্রতিটি আক্রমণ এবং সমর্থকদের গর্জন—সব মিলিয়ে এক অনন্য সাধারণ রাত পার করল অ্যানফিল্ড। ভবিষ্যতে লিভারপুল এই ফর্ম ধরে রাখতে পারলে লিগ টেবিলের আরও ওপরে উঠে আসা তাদের জন্য কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমরা আশা করি, ফুটবলের এই রোমাঞ্চ আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং দর্শকরা আরও অনেক স্মরণীয় ম্যাচ উপহার পাবেন।